May 29, 2019

নারায়ণ চক্রবর্তী একজন খ্যাতিমান চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব

দেশীয় চলচ্চিত্রের বয়স এরইমধ্যে গৌরবের সাথে ৬ দশক পেরিয়ে গেছে। আর এই চলচ্চিত্রে ষাটের দশক থেকে স্বাধীনতা-উত্তর পর্যন্ত বেশ কয়েকজন চরিত্রাভিনেতার আগমন ঘটেছে চলচ্চিত্রাঙ্গনে। যারা নিজেদের অভিনয় দক্ষতায় মাতিয়েছেন দেশের চলচ্চিত্র প্রেমীদের, চলচ্চিত্রকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। তাদের মাঝে অন্যতম ছিলেন নারায়ণ চক্রবর্তী। দীর্ঘ চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারে অভিনয় করেছেন অসংখ্য সুপারহিট ছবিতে। ১৯২৬ সালে মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান থানার কোলাগ্রামে অভিনেতা নারায়ণ চক্রবর্তী জন্মগ্রহণ করেন। চার ভাই এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। বাবা ছিলেন সঙ্গীতানুরাগী। ভারত বিভক্তির পর বাবা বদলি হয়ে কলকাতায় গেলে নারায়ণ চক্রবর্তীদের রেখে যান বিক্রমপুরে। শিক্ষাজীবন বিক্রমপুর স্কুলে। তিনি ১৯৪৪ সালে মেট্রিক পাশ করেন। লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ কম থাকায় কলেজে ভর্তি না হয়ে কারিগরি বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন। খিদিরপুর ইন্ডিয়ান অক্সিজেন অ্যান্ড অ্যাসোটাইল কোম্পানিতে ইলেক্ট্রিক ও গ্যাস ওয়েল্ডিংয়ের কাজ শিখে ওই কোম্পানিতে চাকরি জীবন শুরু করেন। ২ মাস চাকরি করার পর ফ্রেন্ডস মটর ওয়ার্কস নামে এক কোম্পানিতে যোগ দেন এই অভিনেতা।

বাবা চাইতেন ছেলে লেখাপড়া করুক। ফলে বাবার কাছে নিজেদের বাড়ির নিচতলায় একটি মোটর ওয়ার্কশপ করতে চাইলে বাবা রাজি হননি। বাবার অজান্তে কলকাতার পোস্ট অ্যান্ড টেলিগ্রাফ ডিপার্টমেন্টে চাকরির আবেদন করেন এবং বাবার খুড়তুতো ভাই ডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার হওয়ায় চাকরিও হয়ে যায়। মেট্রিক পরীক্ষার পর ১৯৪৪ সালে বাবার প্রতিজ্ঞা রক্ষার জন্য রেখা চক্রবর্তীর সাথে বিয়ে হয় নারায়ণ চক্রবর্তীর। ১৯৪৬ সালে চাকরি হওয়ার পর টেলিফোন অপারেটর হিসেবে ট্যাংক এক্সচেঞ্জ অফিসে কাজ করতেন। ১৯৪৭ সালে কলকাতায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধে। ভারত পাকিস্তান ভাগ হলে বিভাগীয় প্রকৌশলীকে অনুরোধ করে পূর্ব পাকিস্তানের কুষ্টিয়ায় পোস্টিং নিয়ে চলে আসেন।

চাকরি আর অবসর সময় ফুটবল খেলা দেখা, এভাবে সময় কাটে তার। কুষ্টিয়া মোহিনী মিলের মালিক কানু চক্রবর্তীর সহযোগিতায় কুষ্টিয়া প্রথম বিভাগ ফুটবল দলে টাউন মাঠে খেলার সুযোগ হয়। সুজাতার বাবার বাড়িতে পেয়িং গেস্ট হিসেবে থাকার ব্যবস্থা হয়। কিছুদিন পর রাজবাড়িতে বদলি করা হয় এবং রাজবাড়ি থেকে রাজশাহী বদলি করে দিলে ঘোড়ামারা নবারুন ক্লাবে যোগ দেন। এরইমধ্যে নায়িকা চিত্রা সিনহার বাবার সাথে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। এরপর রাজবাড়ি রেলওয়ে ক্লাবের বাত্সারিক নাটক সিরাজউদ্দৌলাতে প্রথম অভিনয় করেন তিনি। প্রথম অভিনয়ে ভালো পারফর্মেন্সের জন্য রৌপ্য পদক অর্জন করেন।

পরবর্তীতে তাকে ঢাকায় বদলি করা হয় এবং বাংলাবাজারে বাসা ভাড়া নিয়ে লক্ষ্মীবাজার এলাকায় নিয়মিত মঞ্চনাটকে অভিনয় করতে থাকেন। নাটকের দলে ছিলেন বিনয় বিশ্বাস, ড. আজম, নূরুল আলম খান, ভবেশ মুখার্জি, শিরিন চৌধুরী, কাফি খান, হোসনে আরা। ঢাকায় তার প্রথম মঞ্চনাটক শাহাজাহান। মঞ্চস্থ হয় লক্ষ্মীনারায়ণ মাঠে। আইয়ুব খানের সামরিক শাসন জারি হলে নারায়ণ চক্রবর্তীকে চট্টগ্রামে বদলি করা হয়। সেখানে পরিচয় হয় যাত্রা দলের নায়িকা পুর্ণিমা সেন গুপ্তর সাথে এবং ‘মাটির মা’ নামে যাত্রাপালায় অভিনয় করেন। রূপায়ণ ক্লাব নাম দিয়ে যাত্রাদল গঠন করেন। সেখানে পুর্ণিমা সেন গুপ্ত, অমলেন্দু বিশ্বাস, হামিদ, পটুয়া, তন্দ্রা, কবরীর দুই বোনকে নিয়ে সীতাকুন্ড মেলায় কোহিনুর, মাটির মা, পার্থ সারথী নামে তিনটি পালা করেন পরপর তিন রাত্রি। তিনটি পালা করে যে অর্থ পান তা দিয়ে তিনি ছোটদের জন্য একটি স্কুল নির্মাণ করেন। স্কুলে সকালে ছোটদের ক্লাস হতো, বিকেল বেলায় নাচ-গানের ক্লাস হতো। পর্যায়ক্রমে চট্টগ্রামে কয়েকশ’ যাত্রা পালা করেন। পুনরায় ঢাকায় বদলি হয়ে এসে আবার নাটক করতে থাকেন। এরইমধ্যে নাট্যমহলে নারায়ণ চক্রবর্তীর বেশ নামডাক ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাবাজার এলাকায় সৈয়দ হাসান ইমাম, শওকত আকবর, আক্তার হোসেনসহ খেয়ালী শিল্পী সংঘ নামে একটি ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন।

তবে মাত্র দুটি নাটক করার পর এই সংঘটি ভেঙে যায়। এই সংঘের মাধ্যমে পরিচয় হয় মহিউদ্দিনের (পরবর্তীতে চিত্রপরিচালক) সাথে। তিনি জানান, ঢাকায় ছবি বানাবেন সরওয়ার সাহেব নামে একজন। পুরোনো অনেকের সাথে তিনিও দরখাস্ত করলেন ছবিতে অভিনয়ের জন্য। সরওয়ার সাহেব ছবি না করলেও আবদুল জব্বার খান ঘোষণা দিলেন ছবি করার। তার সাথে পরিচয় ছিল। কিছুদিন পর ডকুমেন্টারি নির্মাণ করার উদ্যোগ নিলেন জব্বার খান। তিনটি পর্বের এই ডকুমেন্টারির জন্য আলী মনসুর, ফতেহ লোহানী ও এহতেশামকে নেওয়া হয়। ডকুমেন্টারি ফিল্মে প্রথম কাজ করেন নারায়ণ চক্রবর্তী।

মুখ ও মুখোশের কাজ শুরু হলেও তাকে নেওয়া হয়নি। মহিউদ্দিন ‘তোমার আমার’ ছবির জন্য একটি ছোট্ট চরিত্রে তাকে সুযোগ দেন। লিও ফিল্মস গঠন করা হলে এই প্রতিষ্ঠান থেকে ‘হারানো দিন’ নামে একটি ছবি করা হয়। এহতেশামের সহকারী কামাল আহমেদ তাকে নিয়ে যান এবং হারানো দিন ছবিতে একজন মুহুরির চরিত্রে অভিনয় করেন। এরপর এহতেশামের চান্দা, তালাশসহ এহতেশাম-মোস্তাফিজ পরিচালিত সব ছবিতে অভিনয় করেন। প্রথমদিকে অবশ্য ভালো উর্দু না জানার কারণে এহতেশাম নিতে চাননি। পরে উর্দু শিখে তাদের ছবিতে অভিনয় করেন। এরইমধ্যে জহির রায়হানের কখনো আসেনি, কাঁচের দেয়াল ছবিতে অভিনয় করেন। এরপর আর নারায়ণ চক্রবর্তীকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ঋত্বিক কুমার ঘটকের বঙ্গে ও তিতাস একটি নদীর নামছবিতে অভিনয় করেন। এই অভিনেতা তার অভিনয়জীবনে অসংখ্য ছবিতে রেখেছেন নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর। তার অভিনীত চলচ্চিত্রের মাঝে উল্লেখযোগ্য হলো হারানো দিন, কখনো আসেনি, কাঁচের দেয়াল, কাগজের নৌকা, মহুয়া, চাওয়া পাওয়া, আবির্ভাব, চেনা অচেনা, রূপকুমারী, অপরিচিতা, রূপবানের রূপকথা, বেদের মেয়ে, আগন্তুক, নীল আকাশের নিচে, পদ্মা নদীর মাঝি, অবুঝ মন, কাঁচের স্বর্গ, আলোর মিছিল, লাঠিয়াল, ডাকপিয়ন, ঘর সংসার, ছুটির ঘণ্টা, কলংকিনী, ঘরে বাইরে, সত্ ভাই, আমানত, সতী কমলা, অগ্নিকন্যা, লাওয়ারিশ প্রভৃতি।

স্বাধীনতার পর প্রায় সব খ্যাতিমান পরিচালকের ছবিতে কাজ করেছেন তিনি। অভিনয়জীবনে নারায়ণ চক্রবর্তীর বেদনাদায়ক স্মরণীয় ঘটনা ছিল প্রীত না জানে রীত ছবির সিলেটে আউটডোর লোকেশনে নায়ক রহমানের সাথে গাড়ি দুর্ঘটনায় রহমানের পা হারিয়ে ফেলা। সেই গাড়িতে নারায়ণ চক্রবর্তী ছিলেন রহমানের সাথে। ১৯৯৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি এই অসাধারণ প্রতিভাবান চলচ্চিত্র অভিনেতা সবাইকে ছেড়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *