July 2, 2020

লঞ্চডুবির ১৩ ঘণ্টা পর জীবিত উদ্ধার হওয়া সুমন বেপারীর বক্তব্যকে ‘অসংলগ্ন’

বুড়িগঙ্গায় লঞ্চডুবির ১৩ ঘণ্টা পর জীবিত উদ্ধার হওয়া সুমন বেপারীর বক্তব্যকে ‘অসংলগ্ন’ বলে মন্তব্য করেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি। গতকাল বুধবার তদন্ত দলের সদস্যরা মোবাইল ফোনে তার বক্তব্য নেন। তারা বলেছেন, সুমন যে বক্তব্য দিয়েছেন তাতে ১৩ ঘণ্টা পর তার বেঁচে আসার বিষয়টি স্পষ্ট হচ্ছে না। তিনি অসংলগ্ন তথ্য দিয়েছেন।

তদন্ত কমিটি গতকাল আরও সাতজনের বক্তব্য নিয়েছে। তাদের মধ্যে ডুবে যাওয়া লঞ্চটির যাত্রী হিমেল ও সেটির মালিক জয়নাল আবেদীনও রয়েছেন। অন্যরা হলেন উদ্ধার কাজে নিয়োজিত বিভিন্ন সংস্থার কর্মী এবং নৌযান শ্রমিক ইউনিয়নের এক নেতা। সদরঘাটে বিআইডব্লিউটিএ কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে তদন্ত কমিটি এই সাক্ষ্য নিচ্ছে।

লঞ্চডুবিতে হতাহত সবার বাড়িই মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায়। বেঁচে যাওয়া লোকজন এবং নিহতদের স্বজনকে সাক্ষ্য দিতে ঢাকায় পাঠানোর জন্য মুন্সীগঞ্জের ডিসির কাছে চিঠি পাঠিয়েছে তদন্ত কমিটি। এদিকে ডুবে যাওয়া লঞ্চটির দুই চালক বেঁচে আছেন বলে ধারণা করছেন তদন্তকারীরা। কারণ উদ্ধার হওয়া লাশের তালিকায় তাদের নাম নেই।

গত সোমবার সকালে মর্নিং বার্ড নামের ছোট আকারের একটি লঞ্চ অর্ধশতাধিক যাত্রী নিয়ে সদরঘাটের অদূরে ময়ূর-২ নামের বিশাল একটি লঞ্চের ধাক্কায় মাত্র কয়েক সেকেন্ডেই ডুবে যায়। এরপর মঙ্গলবার পর্যন্ত ৩৪ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। সোমবার রাতে লঞ্চটি টেনে তোলার সময় সুমন বেপারীকে জীবিত উদ্ধারের কথা বলা হয়। লঞ্চটি তোলা সম্ভব না হলেও উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।

ওই লঞ্চডুবির ঘটনায় দায়ের মামলার কোনো আসামিকেও গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। গতকাল দুপুরে লঞ্চডুবির স্থলে গিয়ে দেখা যায়, লঞ্চটি বুড়িগঙ্গার দক্ষিণ তীরে উপুড় হয়ে রয়েছে। সেখানে অনেক দর্শনার্থী ভিড় করে ছবি তুলছেন।

তদন্ত-সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, অন্তত ৩০ মিনিট ধরে সুমন বেপারীর বক্তব্য রেকর্ড করা হয়। তিনি বলেছেন, লঞ্চে তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। ডুবে যাওয়ার বিষয়টি তার মনে পড়ছে না। উদ্ধারের পর সবকিছু জানতে পারেন। উদ্ধারের পর সুমন বেপারীকে চিকিৎসার জন্য মিটফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসা শেষে গতকাল তিনি বাড়ি ফিরেছেন। সেখান থেকেই তদন্ত দলের কাছে বক্তব্য দেন তিনি। সুমন তদন্ত কমিটিকে বলেন, ভেতরে হাঁটুপানি ছিল। পুরো রুমটা অন্ধকার ছিল। তার জ্ঞান ছিল না। ডুবে যাওয়ার সময় তার পেটেও পানি চলে যায়।

তদন্ত কমিটির প্রধান নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব রফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, তারা সুমন বেপারীর বক্তব্য নিয়েছেন। তবে ১৩ ঘণ্টা ধরে ডুবে যাওয়া লঞ্চের ভেতরে তিনি কীভাবে থাকলেন, তার বক্তব্যে তা স্পষ্ট হয়নি। সংশ্নিষ্ট অনেকের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলে তার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

তদন্ত কমিটির আরেক সদস্য গণমাধ্যমকে বলেন, সুমন ইঞ্জিন রুমে আটকা পড়েছিলেন বলে দাবি করেছেন। একবার বলেছেন, ভেতরে অন্য কাউকে দেখেননি। পরক্ষণেই আবার বলেছেন, ভেতরে লাশ দেখা গেছে। তার বক্তব্য অসংলগ্ন মনে হয়েছে। তার আরও বক্তব্য নেওয়া হবে। তিনি কিছুটা অসুস্থ। সুস্থ হলে প্রয়োজনে সরাসরি কথা বলা হবে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তার বিষয়ে এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে না।

এদিকে সুমন উদ্ধারের পর হাসপাতালে জানিয়েছিলেন, তিনি ইঞ্জিন রুমের ভেতর ছিলেন। কিন্তু গতকাল উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া ডুবুরি দলের দায়িত্বশীল এক কর্মী গণমাধ্যমকে বলেছেন, তারা লঞ্চটির ভেতর উদ্ধার অভিযান চালাতে গিয়ে ইঞ্জিন রুমটি তালাবদ্ধ পেয়েছেন। সেই তালা ভেঙে ভেতরে তল্লাশি চালিয়ে একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। ওই সময় আশপাশে জীবিত কাউকে ডুবুরিদল দেখতে পায়নি।

দুই চালক হাওয়া : ডুবে যাওয়া লঞ্চটিতে ঘটনার সময় বাদল ও শহীদ নামের দুইজন চালক ছিলেন। তবে লঞ্চডুবিতে নিহত ৩৪ জনের নামের তালিকায় ওই দুইজন নেই। এ থেকে তদন্ত কমিটি ধারণা করছে, তারা দুইজনই বেঁচে আছেন। পুরো ঘটনা জানতে ওই দুইজনের অনুসন্ধান চলছে।

লঞ্চটির মালিক জয়নাল আবেদীন ওই দুই চালকের নাম জানিয়ে তদন্ত কমিটিকে বলেছেন, ঘটনার পর থেকে তাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে আমির হোসেন ও আশিক নামে লঞ্চের দুই কর্মীর লাশ পাওয়া গেছে। আমির হোসেন লঞ্চের মাস্টার ছিলেন আর আশিক ইঞ্জিন রুম সহকারীর দায়িত্ব পালন করতেন।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির অন্যতম সদস্য নৌপুলিশের ঢাকা জোনের পুলিশ সুপার খন্দকার ফরিদুল ইসলাম সমকালকে বলেন, তদন্তের স্বার্থেই ডুবে যাওয়া লঞ্চটির চালকদের দরকার। লঞ্চটির ফিটনেস ছিল কিনা বা ডুবে যাওয়ার সময় তাদের ভূমিকা কী ছিল, সেটা জানা দরকার। কিন্তু তাদের পাওয়া যাচ্ছে না। নিহতের তালিকাতেও তাদের নাম নেই।

তদন্ত কমিটির এই সদস্য বলেন, তারা ময়ূর-২ লঞ্চটি পরিদর্শন করেছেন। ডুবে যাওয়া লঞ্চটিও পরিদর্শন করবেন। তবে সেটি এখনও নদীতে ডুবন্ত অবস্থায় রয়েছে। এজন্য অপেক্ষা করছেন। লঞ্চটি টেনে তোলা সম্ভব না হলে ওই রুটে চলাচলকারী একই সাইজের লঞ্চ পরিদর্শন করে তদন্ত দলে থাকা বুয়েট ও বিআইডব্লিউটিএর দুই বিশেষজ্ঞ সদস্য সিদ্ধান্ত দেবেন।

এদিকে ফায়ার সার্ভিসের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কর্মকর্তা লিমা খানম জানান, লঞ্চডুবির স্থল ও আশপাশের এলাকায় এখনও ফায়ার সার্ভিসের একটি ভ্রাম্যমাণ ডুবুরিদল অবস্থান করছে। কোনো লাশ ভেসে উঠলে তারা উদ্ধার করবেন। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত নতুন করে কোনো লাশ পাওয়া যায়নি।

এদিকে মর্নিং বার্ড লঞ্চটি ডুবে যাওয়ার ঘটনায় ময়ূর-২ লঞ্চের মালিক মোফাজ্জল হামিদ ছোয়াদ, মাস্টার আবুল বাশার, জাকির হোসেন, ড্রাইভার শিপন হাওলাদার, মাস্টার শাকিল ও সুকানি নাসিরের নামে মামলা করেছিল নৌপুলিশ। কিন্তু গতকাল বুড়িগঙ্গা ট্র্যাজেডির তিন দিন পার হলেও পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।

সদরঘাট নৌপুলিশ থানার ওসি রেজাউল করিম গণমাধ্যমকে জানান, আসামিদের গ্রেপ্তারে নৌপুলিশের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। সম্ভাব্য একাধিক এলাকায় অভিযান চালানো হয়েছে। নৌপুলিশের একাধিক দল অভিযানে রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *